গত সোমবার ভোরে মুন্সীগঞ্জ সদরের মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের চরডুমুরিয়া গ্রামে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। থেমে থেমে কয়েক দফা গোলাগুলিতে লিপ্ত হয় পক্ষ দুটি। এতে গুলিবিদ্ধসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। গ্রেপ্তার এড়াতে তাদের কেউ কেউ গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। নিহত রায়হান চরডুমুরিয়া খানবাড়ির রুস্তম খানের ছেলে।
আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ওয়াহিদ মোল্লা পক্ষের জিন্নত মীর ও হোসেন মীরদের সঙ্গে ফ্রান্স প্রবাসী বিএনপি নেতা আব্দুর রহিম মোল্লার পক্ষের আরিফ মীরদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আরিফ মীর (৩৮) নিহত হন। এ সময় ইমরান, রায়হানসহ গুলিবিদ্ধ হন আরও একাধিক ব্যক্তি।
ঢামেকে চিকিৎসাধীন রায়হান খানের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন মুন্সীগঞ্জ সদর থানার ওসি এম সাইফুল আলম। তিনি বলেন, রায়হান খান নিহতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। অভিযোগ পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুই শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা
সোমবার সকালে নিহত বিএনপি কর্মী আরিফ মীরের স্ত্রী পারুল বেগম বাদী হয়ে সদর থানায় একটি মামলা করেছেন। গতকাল বিকেলে করা এ মামলায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতিক মল্লিককে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে ৫৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনসহ মোট দুই শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ সদর থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, বিএনপি নেতা আতিক মল্লিককে প্রধান আসামি করে ২০০ জনের বিরুদ্ধ নিহত আরিফ মীরের স্ত্রী পারুল বেগম মামলা করেছেন।
চরডুমুরিয়ায় আতঙ্ক
গোলাগুলির ঘটনার পর থেকে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। আবারও সংঘর্ষের আশঙ্কায় চরডুমুরিয়াসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, গ্রামগুলোতে দিনের বেলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। রাত হলেই অজানা আতঙ্ক ভর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও ভয় কাটছে না।
স্থানীয়রা জানান, গ্রেপ্তার এড়াতে দিনের বেলায় নিরাপদ স্থানে অবস্থান করলেও রাতে বিএনপির দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা গ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে মহড়া দেন। তাদের এমন তৎপরতার কারণে আবারও সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন গ্রামবাসী।
মোল্লাকান্দির চরডুমুরিয়া, রাজারচর, আমঘাটা, মহেশপুর, পূর্ব ও পশ্চিম মাকহাটী গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি গ্রামে আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার এড়াতে গ্রামগুলোর পুরুষরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। বসতবাড়িতে অবস্থান করছেন নারী ও শিশুরা। সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করা গেছে।
আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। এর জের ধরে তাদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। গত ২ নভেম্বর রাতে ইউনিয়নের মুন্সীকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে প্রতিপক্ষ গুলি চালিয়ে তুহিন দেওয়ানকে হত্যা করে। তিনি বিএনপির ওয়াহিদ-আতিক মল্লিক গ্রুপের সমর্থক। ওই হত্যার বদলা নিতেই সোমবার সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ। এ সময় গুলিতে নিহত হন আরিফ মীর। গতকাল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গুলিবিদ্ধ রায়হান খান। এ নিয়ে দুই গ্রুপের বিরোধে ৯ দিনের ব্যবধানে তিনজন নিহত হলেন।
পুলিশ ও গ্রামবাসী জানায়, মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জেলা বিএনপির সদস্য আতিক মল্লিক ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ওয়াহিদ মোল্লা এবং সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আলী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লার পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল।
নিহত আরিফ মীর ও রায়হান খান সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আলী ও মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লা গ্রুপের কর্মী বলে জানা গেছে।
রূপগঞ্জে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ভোরে উপজেলার তারাব পৌরসভার তারাব বাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারাব বাজার এলাকার যুবদল নেতা নবী ও শ্রাবণ– এই দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার নিয়ন্ত্রণ, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। এর জেরে গতকাল ভোরে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের শতাধিক নেতাকর্মী দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সংঘর্ষের সময় গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। তাৎক্ষণিক তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
স্থানীয়রা আরও জানান, নবী ও শ্রাবণের অনুসারীরা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে লিপ্ত। তাদের প্রভাবে এলাকায় কিশোর গ্যাং, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির প্রবণতা বেড়ে গেছে। এ কারণে স্থানীয় সাধারণ মানুষ সব সময় আতঙ্কে দিন কাটান।
রূপগঞ্জ থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। সংঘর্ষে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে কিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।