মারা গেছেন মিয়ানমার জান্তা সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মিন্ট সোয়ে। বার্ধক্যজনিত কারণে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) সকালে রাজধানী নেপিদোর একটি হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয় বলে সামরিক সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
মিন্ট সোয়ে ২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন, যখন অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে দেশটির সেনাবাহিনী।
তবে গত বছর থেকে পারকিনসন রোগে ভোগার কারণে তিনি দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি পান। এরপর সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং নিজেই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘প্রো টেম প্রেসিডেন্ট ইউ মিন্ট সোয়ে আজ সকাল ৮টা ২৮ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজন করা হবে।
’
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, মৃত্যুর আগে তিনি ওজন কমা, ক্ষুধামান্দ্য, জ্বর ও মানসিক সক্ষমতা হ্রাসের মতো জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন এবং আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী সাবেক প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট এবং গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চিকে গ্রেপ্তার করে ক্ষমতা দখল করলে মিন্ট সোয়ে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হন।
ওই সময় তিনি প্রথম ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত প্রো-মিলিটারি দলের সদস্য ছিলেন। অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ এই পদোন্নতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কারণ উইন মিন্ট পদত্যাগ করেননি বা অক্ষম ছিলেন না।
তা সত্ত্বেও মিন্ট সোয়ে জান্তা সরকারের অনুগত থেকে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের নেতৃত্ব দেন, যা কার্যত সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। তার সভাপতিত্বেই ওই পরিষদ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের হাতে।
তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন্ট সোয়ের ক্ষমতা ছিল নামমাত্র। সরকার পরিচালনার সব ক্ষমতা ছিল মিন অং হ্লাইংয়ের হাতে। মিন্ট সোয়ে কেবল প্রথাগত দায়িত্ব পালন করতেন, যেমন জরুরি অবস্থার মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর দেওয়া।
সাবেক জেনারেল মিন্ট সোয়ে ছিলেন আগের সামরিক সরকারপ্রধান থান শ্বের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং তার আগে দীর্ঘদিন সেই অঞ্চলের সামরিক কমান্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে হওয়া গণআন্দোলন, যেটি আন্তর্জাতিকভাবে ‘স্যাফ্রন বিপ্লব’ নামে পরিচিত, দমন করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ওই সময় তার নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা ও শত শত মানুষকে আটক করা হয়। মিন অং হ্লাইং গত সপ্তাহে দেশজুড়ে ঘোষিত জরুরি অবস্থার সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন এবং ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তবে বিরোধী দলগুলো ইতোমধ্যে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।
জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞ গত জুনে এই নির্বাচনের পরিকল্পনাকে ‘প্রতারণামূলক’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এটি জান্তা সরকারের শাসন টিকিয়ে রাখার একটি উপায়মাত্র। অং সান সু চি এখনো কারাগারে রয়েছেন এবং গত চার বছর ধরে গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরে এখনো চলমান গৃহযুদ্ধ, জাতিগত সশস্ত্র দলগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ, এবং জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্যে মিন্ট সোয়ের মৃত্যু নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহ তৈরি করেছে।