মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন চরমে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির আহ্বানের মধ্যেও ইরানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরণের সময় ও পরে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক মহল জানিয়ে দিয়েছে—তারা এই সংঘাতে পিছু হটবে না বরং ‘প্রতিরোধের পথেই’ এগিয়ে যাবে।
বিস্ফোরণের বিস্তারিত
স্থানীয় সময় সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের একটি সামরিক স্থাপনায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের শব্দ রাজধানী তেহরান থেকেও শোনা যায়।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরিবি (IRIB) জানিয়েছে, বিস্ফোরণে এখনও পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতলে নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্র অনুসারে, বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। তবে নিরাপত্তা বাহিনী সম্ভাব্য ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দিকেই সন্দেহ করছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা
এর আগে, এক ভিডিও বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন—
> “আরো রক্তপাত বন্ধ করার এখনই সময়। আমি উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হোক।”
ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এখন আর ‘শাসক পরিবর্তন’ নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হবে। তার এই বক্তব্য অনেক বিশ্লেষকের কাছে একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।
ইরানের পাল্টা বার্তা: “সমঝোতা নয়, প্রতিরোধই একমাত্র পথ”
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) এক বিবৃতিতে জানায়, তারা কোনো বিদেশি চাপ বা মিডিয়া প্রচারণার ফাঁদে পা দেবে না। এক মুখপাত্র বলেন—
“আমরা শান্তিপ্রিয়, তবে দুর্বল নই। কেউ যদি আমাদের উপর আঘাত হানে, আমরা দ্বিগুণ জবাব দেব।”
ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন
> “এই লড়াই অস্তিত্বের নয়, ন্যায়ের। ট্রাম্প যা-ই বলুন, আমাদের প্রতিরোধ থামবে না। শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আমরা লড়ব।”
এই ঘোষণায় প্রমাণিত হয়, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসলেও বাস্তবে ইরান লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পরপরই জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস সকল পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন—
> “এ মুহূর্তে যুদ্ধ নয়, শান্তি প্রয়োজন। সংঘাত বন্ধ করে মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া উচিত।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) তাদের বিবৃতিতে মধ্যস্থতার আহ্বান জানিয়ে জানিয়েছে—
> “যেকোনো সামরিক সংঘর্ষ বন্ধ করতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে।”
তবে ইসরায়েল এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি, যদিও তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
অঞ্চলজুড়ে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে বিস্ফোরণের ঘটনায় যুদ্ধবিরতির আশা অনেকটাই নস্যাৎ হয়ে গেছে। এই বিস্ফোরণ ও পাল্টা ঘোষণাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
বিশ্ববাজারেও এই সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তেলের দাম বাড়ছে, আর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তুরস্ক, কাতার ও চীনসহ একাধিক দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি।
পরিশেষে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আন্তর্জাতিকভাবে কিছুটা প্রশংসিত হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। ইরানে বিস্ফোরণের ঘটনা প্রমাণ করেছে—সংঘাত এখনও চলমান এবং উভয় পক্ষই সমঝোতার বদলে শক্তির ভাষায় কথা বলছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক ও মানবিক মহলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।