• শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ০৬:৪৮ পূর্বাহ্ন
  • |
  • |

কপি-পেস্ট সংবাদ প্রকাশ: ময়মনসিংহের ১৩ পত্রিকাকে ডিসির নোটিশ

স্পষ্টবাদী ডেস্ক / ১৪৫ Time View
Update : সোমবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৫
জেলা প্রশাসনের অভিযোগ, এইসব পত্রিকার অনেকটিরই নিজস্ব সংবাদদাতা নেই, সুনির্দিষ্ট প্রেসে সেগুলো ছাপাও হয় না

জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দাবি, একই খবর একই শিরোনামে ভিন্ন ভিন্ন দিনে ছাপানো প্রেস এন্ড পাবলিকেন্স আইন বিরোধী। “সেই কারণেই তাদের নোটিশ দেয়া হয়েছে,” বলেছেন জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম।

তবে নোটিশ পাওয়ার পর কয়েকজন সম্পাদক ডয়চে ভেলের কাছে সংবাদ প্রকাশ করায় ডিসির বিরুদ্ধে হয়রানি করার অভিযোগ এনেছেন। সম্পাদকদের দাবি, তারা আইনের কোনো লঙ্ঘন করেননি।

ডিসি অবশ্য এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রসঙ্গত, ময়মনসিংহে অন্যান্য় জেলার প্রেসক্লাবের স্বাভাবিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ডিসিই পদাধিকার বলে প্রেসক্লাবের সভাপতি।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট উম্মে হাবিবা মীরা স্বাক্ষরিত ১৬ এপ্রিলের ওই নোটিশে বলা হয়েছে, ওই ১৩টি পত্রিকায় সম্পাদক এবং প্রকাশক ভিন্ন হওয়ার পরও ‘একই সংবাদ, একই আঙ্গিকে, একই তারিখে’ পত্রিকাগুলোতে প্রকাশ করা হয়েছে। কোন কোন তারিখে এমন ঘটনা ঘটেছে, সেসব তারিখও উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে নোটিশে।

এইভাবে খবর পরিবেশন কেন অবৈধ হবে না তা পরবর্তী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে হাজির হয়ে জানাতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ওই পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়েছে।

নোটিশপ্রাপ্ত পত্রিকাগুলো হলো শামসুল আলম খান সম্পাদিত দৈনিক আজকের ময়মনসিংহ, এফ এম এ ছালাম সম্পাদিত দৈনিক দেশের খবর, এন বি এম ইব্রাহীম খলিল রহিম সম্পাদিত দৈনিক বিশ্বের মুখপত্র, আব্দুর রাজ্জাক তালুকদার সম্পাদিত দৈনিক ঈশিকা, নাসির উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত দৈনিক অদম্য বাংলা, আফসর উদ্দিন সম্পাদিত দৈনিক সবুজ, আ ন ম ফারুক সম্পাদিত দৈনিক আলোকিত ময়মনসিংহ ও দৈনিক দিগন্ত বাংলা, শেখ মেহেদী হাসান নাদিম প্রকাশিত দৈনিক জাহান, ওমর ফারুক সম্পাদিত দৈনিক কৃষাণের দেশ, এম এ মতিন সম্পাদিত দৈনিক নিউ টাইমস, ফরিদা ইয়াসমীন সম্পাদিত হৃদয়ে বাংলাদেশ ও বিকাশ রায় সম্পাদিত সাপ্তাহিক পরিধি।

চলতি বছরের ৩০ মার্চ এবং ৭, ৮, ৯, ১০, ১২ ও ১৩ এপ্রিল একই সংবাদ ওই পত্রিকাগুলোতে একই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে নোটিশে।

ময়মনসিংহের ডিসি মুফিদুল আলম ডিডাব্লিউকে বলেন, “পত্রিকার ডিক্লারেশন দেয় জেলা প্রশাসন। সেখানে যে বিধান আছে তার ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা নেয়া বা নোটিশ দেয়া যায়। ওই পত্রিকাগুলো আসলে কপিপেস্ট করছে। একই খবর একই শিরোনামে দাড়ি, কমা , সেমিকোলন সব এক হয় কীভাবে! এটাতো প্লেজারিজম। আমি নিজে ওই পত্রিকাগুলো পড়ে দেখেছি। তারা আসলে খবর সংগ্রহ করে না। তারা অন্য সংবাদমাধ্যমের খবর কপি করে।”

পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে বলেও জানান ময়মনসিংহের ডিসি। তিনি বলেন, “তাদের পত্রিকায় যে প্রেসের ঠিকানা ছাপা হয়, সেখান থেকে ছাপেন বলে আমার সন্দেহ আছে। কেউ কেউ ঢাকা থেকেও ছাপেন।”

নোটিশের ঠিকঠাক জবাব দিতে পারলে ‘কোনো সমস্যা নাই’, বলে জানিয়েছেন মুফিদুল ইসলাম।

নোটিশপ্রাপ্তদের একজন দৈনিক আজকের ময়মনসিংহের সম্পাদক শামসুল আলম খানের দাবি, ডিসি সাংবাদিকদের চাপে রাখতে চান।

তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, “জেলা প্রশাসকের অপসারণের দাবিতে সাংবাদিকরা র‌্যালি করেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অনেক নিউজ হয়েছে, সেই কারণে তিনি হয়রানিমূলকভাবে ওই নোটিশ দিয়েছেন। তিনি ময়মনসিংহের সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে চান।”

বর্তমান ডিসির বিরুদ্ধে আগের সরকারের (আওয়ামী লীগ) পক্ষে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন শামসুল আলম খান। তার অভিযোগ, “তিনি চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছিরের পিএস ছিলেন। আমরা সেগুলো বলায় তিনি নোটিশ দিয়েছেন। আমরা তার এই নোটিশের বিরুদ্ধে কর্মসূচি ঘোষণা করবো।”

পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক কিভাবে প্রেসক্লাবের সভাপতি হন, এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দৈনিক আজকের ময়মনসিংহের সম্পাদক।

হৃদয়ে বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমীন অবশ্য স্বীকার করেছেন, এমন অনেক পত্রিকা আছে যাদের কোনো সাংবাদিই নেই। এসব পত্রিকা ছাপাখানার তথ্যও ভুল দিয়ে থাকে বলে জানান তিনি।

ফরিদা বলেন, “পত্রিকার ডিক্লারেশনে যে প্রেসের ঠিকানা থাকে সেইখানে ছাপতে হয়। এখানে অনেক পত্রিকা আছে যা সেভাবে ছাপা হয়না। ঢাকা থেকেও ছাপা হয়।  আবার একই প্রেস থেকে অনেক পত্রিকা ছাপা হয়। প্রথম আর শেষ পৃষ্ঠা ছাড়া ভিতরে সব একই। আসলে একই খবর কপি করা হয়। কোনো কোনো পত্রিকা আছে যার নামও আমি শুনিনি।”

১৯৬৩ প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার সময় থেকে পদাধিকার বলে ডিসিকে প্রেসক্লাবের সভাপতি ঘোষণা করা হয়ে আসছে। তবে সাংবাদিক না হয়েও জেলা প্রশাসকের প্রেসক্লাব সভাপতি হওয়ার  ভালো দেখায় না বলে মনে করেন ফরিদা ইয়াসমীন। তিনি মনে করেন, এটা পরিবর্তন হওয়া দরকার।

জেলা প্রশাসকও এর সঙ্গে একমত। তিনি বলেছেন, “আমি একদিন মাত্র প্রেসক্লাবে গিয়েছি। আমিও মনে করি আমার সভাপতি থাকা ঠিক না। সদস্যরা চাইলে এই নিয়মের পরিবর্তন করতে পারেন।”

তবে নোটিশের ব্যাপারে অভিযোগ মানতে নারাজ তিনি। তিনি বলেন, “যে নোটিশ দেয়া হয়েছে তা স্বপ্রণোদিত হয়ে দিয়েছি। কেউ আমাকে দিতে বলেনি বা  অভিযোগ করেননি।”

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, “জেলা প্রশাসক সম্পাদকদের নোটিশ দিয়ে ঠিক করেছেন বলে আমি মনে করি না। তিনি মামলা করতে পারতেন। তথ্য মন্ত্রণালয়কে জানাতে পারতেন। প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারতেন। তা না করে তিনি যেটা করেছেন সেটা হয়রানিমূলক বলে আমি মনে করি।”

তবে সুপ্রিম কার্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, “প্রেস এন্ড পাবলিকেশনস আইন অনুযায়ী জেলা প্রশাসক সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন দেন। সেই আইন যদি লংঙ্ঘন হয় তাহলে তিনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।”

তার কথা, “মানহানিকার, মিথ্যা, ভুয়া বা হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে তিনি আদালতে মামলা করতে পারেন। কিন্তু কোনো সংবাদপত্র যদি কপিপেস্ট করে, তাহলে তিনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। কারণ আইন অনুযায়ী সংবাদপত্র তার সাংবাদিকদের দিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে প্রকাশ করবে। অন্যের খবর তো কপিপেস্ট করে প্রকাশ করা যাবে না।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category